একটা মানুষের জীবন কখনোই শুধুমাত্র সুখের সাগরে কিংবা দুঃখের সাগরে প্রবাহিত হয় না। সুখ – দুঃখ পাশাপাশি থাকে বলেই তাদেরকে বোন হিসেবে মুখে মুখে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। বোনেরা যেমন এক আত্মার মানবী হয় ঠিক তেমনই সুখ – দুঃখ এক সাগরের পদ্ম হয়।
আপাতদৃষ্টিতে দুঃখকে মানুষ এড়িয়ে চলতে চাইলেও দুঃখই কিন্তু মানুষের জীবনকে শৃঙ্খল এবং সৌন্দর্যময় করে তুলে।তবে সেই সৌন্দর্যের স্বাদ পেতে হলে অবশ্যই দুঃখকে জয় করতে জানতে হবে। দুঃখকে এড়িয়ে না চলে দুঃখ কিভাবে একটা মানুষকে এড়িয়ে চলে তার টেকনিক জানতে হবে।
আমার মতে হুটহাট দুঃখ পাওয়া জীবন নামক স্বাস্থ্যের জন্য আবশ্যক। এতে দুঃখ পেলে ভেঙে পড়ার প্রবণতা কম থাকে। সিলিং ফ্যানে স্বপ্ন ঝুলানোর কথা মাথায় আসা তো দূরে থাক বরং এমন বোকামি করার কথা শুনলেই হাসি আসে। পরবর্ততে আসা ঝড় মোকাবিলা করার রসদ জমা করা যায়। যদিও একাজে প্রবল আত্মবিশ্বাস থাকা চাই। থাকা চাই মনোবলের পাহাড়। কিন্তু আশার কথা হচ্ছে এই আত্মবিশ্বাস এবং মনোবল বানানোর মেশিনও তৈরি করা যায়। চোখ বুজে কয়েক দফা দুঃখের নদীতে থাকলেই এই মেশিন তৈরি হয়ে যায়। অবশ্য শর্ত থাকে এই যে সর্বদা মনে রাখতে হবে দুঃখের পরে সুখ আসবেই।
সুখ বিষয়টা যদি সবসময় স্থায়ী থাকতো তাহলে তার মূল্য কমতে কমতে শূণ্যের ঘরে এসে পৌঁছাতো। কারণ মানুষের কাছে সর্বদা পাওয়া জিনিসের মূল্য নিতান্তই কম থাকে। সুলভে যা পাওয়া যায় মানুষ তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পছন্দ করে না। একটু দামী বস্তু, একটু উচ্চ আশা মানুষ কায়মনোবাক্যে চায়। এটাই মানুষের বৈশিষ্ট্য। আর এই বৈশিষ্ট্যের জের ধরেই, সুখকে একটু দামী করতেই দুঃখের জন্ম। তাইতো হাজার দুঃখের পর একটুখানি সুখের দেখা পেলেই মনে হয় হীরের টুকরার খোঁজ পাওয়া গেছে। তাই আমার ধারণা অনুযায়ী সুখের চাইতে দুঃখের দামটাই বেশি। দুঃখ একাই যেমন মানুষের আত্মশক্তি বৃদ্ধি করে তেমনি একাই সে সুখকে দামী করে তুলে।
সুখ – দুঃখ যতই দামী কিংবা কমদামী হোক না কেন দুটোই জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার কাজে বেশ পটু। কেউ হয়তো কষ্ট পেয়ে পাথরের মতো নিজেকে শক্ত দলা বানিয়ে ফেলেছে। কেউ হয়তো সুখসাগরে ডুব দিয়ে নিজেকে নতুনরূপে গড়ে তুলেছে। তবে সুখসাগরে ডুব দিয়ে নিজেকে পরিবর্তন করে ফেলার চাইতে দুঃখ সয়ে নিজেকে বানানো পাথরের স্থায়িত্ব বেশি। শক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে এতে মচকানোর কোনো সুযোগই থাকে না।
একমাত্র জীবনের যোগফলই বলতে পারে মানুষের জীবনে কোনটা দামী? সুখ নাকি দুঃখ? বেশিরভাগই হয়তো সুখকে প্রাধান্য দিবে। অনেকেই আবার জীবনে সুখের মুখ দেখে নি বলে হা-হুতাশ করবে। সৃষ্টিকর্তার উপর দোষারোপ করবে। যা নিতান্তই হাস্যকর। তবে জীবনের যোগফলে দুঃখের সাগরকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া উচিত। কারণ জীবনে সুখের চাইতে দুঃখের অবদানটাই বেশি।