বাবারা কঠিন মনের মানুষ, বাবারা সন্তানকে ভালোবাসে না, বাবারা শুধু সন্তানের চাহিদা পূরণ করেই মনে করে তার দায়িত্ব শেষ….. এই কথাগুলো বেশ কঠিন কথা। কঠিন হলেও বেশকিছু সন্তানের মনে তা বারবার উদিত হয়। ভাবে বাবারা বোধহয় মানুষের মন কি জিনিস তা বুঝতেই পারে না। অথচ পৃথিবীতে একজন পুরুষ হিসেবে বাবারা সন্তানকে যে পরিমাণে ভালোবাসে অন্য কেউ তার নখ পরিমাণ ভালোবাসাও দিতে পারে না।

হ্যাঁ! একথা ঠিক যে আপাতদৃষ্টিতে বাবাদের কঠিন মানুষ মনে হয়। মনে হয় তারা মন পড়তে পারার কাজে একেবারে অদক্ষ। কিন্তু সন্তানের চাহিদা মেটাতে না পারলে বাবাদের চোখ বেয়ে নোনতা জলের যে ধারা প্রবাহিত হয় তা অনেক সন্তানেরই চোখে পড়ে না। সন্তান সামান্য অসুস্থতায় ভুগলে মায়ের মতো শিয়রে বসে সারারাত পার না করলেও বাবারা ঠিকই বারান্দায় পায়চারি করতে করতেই রাত সাবাড় করে দেয়। চোখেমুখে থাকে চিন্তার ছাপ। আবার এই বাবারাই সন্তানকে একটু অশুভ ছায়া ছুঁলেই নিজেরা মরিয়া হয়ে পড়ে। ছেঁড়া শার্ট, পুরোনো জুতো জোড়া, কাঁচ ভাঙা চশমা পরিহিত বাবাটিও সন্তানের জন্য রাজার মতো খরচ করতে দ্বিধাবোধ করে না। করবেই বা কি করে? সন্তানই যে তার একটুকরো পৃথিবী।

নিজে হয়তো স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কখনো কলেজের মাঠে পা দেয় নি। কিন্তু সন্তানকে মস্তবড় ব্যারিষ্টার বানানোর জন্য সে কিডনি বিক্রি করতেও প্রস্তুত। বিনিময়ে চাই সন্তানের একটু ভালো থাকার জন্য প্রয়োজনীয় রসদের জোগান।
পৃথিবীতে খারাপ মানুষের অভাব নেই। ভালোভাবে খেয়াল করলেই দেখা যায় কতশত মানুষরূপী অমানুষের আস্তানা এই পৃথিবী। কিন্তু একটু সতর্কদৃষ্টিতে চোখ বুলালেই বুঝতে পারবো একজন সন্তানের কাছে বাবারা কতটা নিরপরাধী! বাবারা যোখানে সন্তানের প্রতি কোনো অনাচারই সহ্য করতে পারে না সেখানে সন্তানের দৃষ্টিতে নিজের অপরাধী বনে যাওয়ার ব্যাপারটা সত্যিই হাস্যকর।
প্রতিটি মানুষের হৃদয়েই ভালোবাসা জমায়িত অবস্থায় থাকে। কেউ হয়তো প্রকাশ করে কিংবা বলে কয়ে তা সার্বজনীন করে ফেলে আবার কেউ হয়তো প্রকাশ না করাতেই সবচেয়ে বেশি স্বস্তি পায়। ভালোবাসা প্রকাশ করা হতে নিজেকে বিরত রাখা সেই মানুষেরা চায় তার ভালোবাসা কখনোই প্রকাশ না পাক। নিজের ভেতর শহরেই তা সীমাবদ্ধ থাকুক। এমন সব উদ্ভট চাওয়া বাবারাও আশা করে থাকে। ফলস্বরূপ সন্তানেরা মনে করে তাদের বাবার হৃদয়ে তাদের প্রতি কোনো অনুভুতিই নেই। তারা কখনোই সন্তানের সামনে কাঠিন্যের পরিমাণ বিন্দুমাত্র কমাতে চায় না। যদিও ব্যাক্তিবিশেষে তা ভিন্ন।

সংসারধর্ম বড় কঠিনধর্ম। এই ধর্ম পালন করতে বেশ খাটতে হয়। একটা সংসারের বোঝা বয়ে বেড়ানোর কষ্টটা কেবল পুরুষেরাই বুঝে। পরিবারের একজন কর্তা হিসেবে বাবাদের যেমন দায়িত্ব পালনে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করতে হয় তেমনই একজন বাবা হিসেবে সন্তানের দিকটাও তাকে খেয়াল রাখতে হয়। এই দু’দিকটা একসাথে সামলানো সত্যিই বড্ড কঠিন কাজ। যার কারণে বাবারা হয়তো মায়া – মমতা বিলাতে গিয়ে একটু হেরফের করে। আর সন্তানেরা অমনি ভেবে বসে তাদের প্রতি বাবাদের কোনো টানই নেই।
আজকাল সন্তানেরা বাবাদের প্রতি কিছুটা উদাসীন। যার প্রমাণ দেশে বৃদ্ধাশ্রমের আধিপত্য বিস্তার। ছোটবেলায় বাবার যে হাত ধরে সন্তানেরা নতুন স্বপ্নে নিজেকে বিলিয়ে দেয় সন্তানেরা সেই হাত ধরেই বাবাদের বৃদ্ধাশ্রমের কোণায় ফেলে চলে আসে। সারাটি জীবন একজন বাবা সন্তানকে বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত থাকে, বিলিয়ে দেয়। প্রয়োজনে সামর্থ্যের বাধাকে ডিঙিয়ে বিকল্প উপায় অবলম্বন করতে দ্বিধাবোধ করে না। বিনিময়ে তার কিছুই চাওয়ার থাকে না। কিন্তু প্রতিটি মানুষের মনেই তো সুপ্ত কিছু চাওয়া-পাওয়ার সমষ্টি থাকে। বাবারাও হয়তো চায় শেষ বয়সে এসে সন্তানের অর্জিত সুখ – সাচ্ছন্দ্যগুলিকে একটু কাছ থেকে উপভোগ করতে। বাবারা অতীতের কষ্টগুলির সার্থক ফল নিজের চোখে উপভোগ করে তৃপ্তি মেটাতে চায়। যা অনেক সন্তানই বুঝতে পারে না কিংবা বুঝেও না বোঝার ভান করে। তবে এ’কথা ঠিক যে, প্রকৃতি কাউকে ছাড় দেয় না। ঘুরে ফিরে প্রতিশোধের পর্বটা আসেই।
